কোমল গান্ধার



একটা বড় টানেলের মধ্যে দিয়ে সে চলেছে, অনেকটা পাতালরেলের সুড়ঙ্গের মত। চলেছে যেন কোনো এক অমোঘ গন্তব্যের দিকে। কেউ কি ডাকছে তাকে?! চারপাশে হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে কতগুলো খুব চেনা মুখ, হাত নেড়ে কিছু বলবার আগেই আবার অন্ধকার। পরের বাঁকেই আবার, উফ্ কী আলো! আলোর কুয়াশা- কিচ্ছু চোখে পড়ে না।
......
বাসসটপে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই বড্ড অসহ্য লাগতে থাকে পর্ণার। এমনিতে এভাবে চুপ করে দাঁড়িয়ে মুখের মিছিল, গাড়ির ভিড়, বিলবোর্ড ইত্যাদি প্রভৃতি দেখতে বেশ ভালোই লাগে ওর, কিন্তু আজ ভীষণ বিরক্ত লাগছে। মার্চের শুরু, ক্যালেন্ডার বলছে বসন্তদিন, অথচ দেখো কি ভ্যাপসা গরম। রুমাল খুঁজতে গিয়ে সারা ব্যাগ তোলপাড়। কোথায় পড়ে গেছে কে জানে, আরো তিরিক্ষি হয়ে গেলো মেজাজটা। ঠিক তক্ষুণি দেখলো, রাস্তা পেরিয়ে আসছে পল্লব। অনেকটা দূরে হলেও চোখেমুখে চিন্তার ভাব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

-“শোন, বাজে কথা বলবো না। SGPT বেশ হাই। এখন তো রেখেই দেবে। কন্ডিশন বেটার সেটা বললো না, তবে আনম্যানেজবল সিচ্যুয়েশন যে নয়, সেটা কিন্তু বললো”
-“করণীয় কী এখন?”
-“ভরসা রাখা, ভেঙ্গে না পড়া। আমি জানি সেটা তুই পারবি”, বলতে বলতে সামনে এসে দাঁড়ানো ট্যাক্সিটায় পর্ণাকে উঠতে ইশারা করে পল্লব। উল্টোদিকের দরজা খুলে নিজেও উঠে পড়ে,”কসবার দিকে চলুন”
-“না রে, আমি বাড়ি যাবো”
-“যাবি, একেবারে রাতে খেয়ে তারপর যাবি।তোর বৌদি বারবার বলে দিয়েছে কিন্তু”
-“না রে আজ ভালো লাগছে না, বলিস বৌদিকে। তোকে গড়িয়াহাটে নামিয়ে বাড়িতেই চলে যাই। ভালো করে স্নান করতে ইচ্ছে করছে খুব”
-“বেশ তাই কর তবে। রেস্ট নে, কিন্তু খেয়ে নিস কিছু”
......

-“কী দেখছো মা তুমি? রোজ রোজ আকাশে কি দেখো তুমি? আমাকে বলো না”
-“একটা তারাকে খুঁজি, জানিস”
-“তারা? কোন তারা?”
-“আছে একটা, আমার বন্ধু ছিলো। ছোটোবেলায় কতো গল্প করতাম ওর সাথে”
-“কোথায় গেলো মা, তারাটা?”
-“কী জানি। তাই তো খুঁজি। খুব মিস্ করি ওকে”
-“তারারা গল্প করে মা?”
-“করে তো। ওই যে ওইই তারা দুটো এখন বলছে, "দেখ দেখ ওই দূরে একটা ছোট্ট ছেলে আর ওর মা দাঁড়িয়ে আছে। ও কিন্তু আজ রাতে দুধটা মাকে লুকিয়ে ওর বেড়ালকে খাইয়ে দিয়েছে।" আরেকটা তারা বলছে, "জানিস, ও আজকে স্কুলে না যাওয়ার বায়না করেছিলো। মা শোনেনি, তাই ও সারাদিন আর মায়ের সাথে ফোনে একটাও কথা বলেনি। ওর মা কিন্তু খুব কষ্ট পেয়েছে।"
-“ওরা জানলো কী করে?”
-“ওরা আকাশ থেকে সব দেখতে পায় তো। ওরাই আবার অনেক রাত্তিরে জোনাকি হয়ে ঘরে ঢুকে দেখে যায় ছেলেটা মাকে জড়িয়ে ধরে কেমন ঘুমিয়ে আছে”
-“মা, দেখো দেখো চাঁদটা কেমন জ্বলজ্বল করছে”
-“হ্যাঁ, চাঁদটাও এবার ওদের আড্ডায় জয়েন করলো। ও বলছে, "তোমরা কি জানো মাকে কষ্ট দিয়ে ওর নিজেরও খুব মনখারাপ হয়েছে। তাই ও মাকে দেবে বলে একটা খুব সুন্দর ছবি এঁকে রেখেছে। আর মা অফিস থেকে ফিরে আজ যে শরবতটা খেয়েছে, সেটা ও নিজে বানিয়েছে। তোমরা তো জানোই না, ও হচ্ছে সবচাইতে সোনা ছেলে"
-“তুমি এগুলো শুনতে পাচ্ছো মা?”
-“হ্যাঁ, চুপ করে শোনো, তুমিও পাবে”
-“হ্যাঁ, মা আমি শুনলাম!!”
-“কী শুনলি??”
-“ওরা বলছে, "ওই মা টাও না সবচাইতে ভালো মা, দ্য বেস্ট মম"।
......

সাড়ে তিনটে বাজে। টেবিলে জমে থাকা কাগজগুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে মনে মনে একটা হিসেব কষে আবার সতেরো ইঞ্চির পর্দায় মুখ ফেরালো পর্ণা।
-“পর্ণাদি, আসবো?”
-“ওমা, তুই আবার কবে থেকে আমার ঘরে পারমিশন নিয়ে ঢোকা শুরু করলি?!”
-“না, দেখলাম খুব মন দিয়ে কাজ করছিস, তাই বললাম”
-“আয়,বলবি কিছু?”
-“বলছিলাম, আজ একবার যাবি নিউ মার্কেট? অল্প কিছু বাকি আছে”
-“সত্যি পারিসও রে। পৃথিবীতে আর কারও বিয়ে হয় না যেন!! বাবা রে বাবা!!”
-“চল না প্লিজ”
-“আজ একাই ঘুরে আয় রে, আমার হবে না। আজ প্রমিস করা আছে, ফিরে অর্কবাবুর সাথে ক্যারম খেলতে হবে”
-“সো সুইট! খুব ভালো ছেলেটারে তোর”
পরের প্রশ্নের জন্য রেডি হয় পর্ণা-
-“শোন না পর্ণাদি, ও কিছু বলে টলে?”
-“না রে। এখনো তেমন কিছু বলে না”
-“মানুষ যে কী করে পারে?!! অত মিষ্টি একটা বাচ্ছা...”
-“মানুষ পারে রে, সব পারে। এই যেমন তুই তোর বাকি কাজটা ঝটপট না সারলে আমাদের মিঃ ম্যানেজার তোর নিউ মার্কেটের প্ল্যানকে দায়িত্ব নিয়ে মাঠে মেরে দিতে পারেন। যা, পালা”
......

-“মা, চাঁদের বাড়ি কি আফ্রিকায়?”
-“কেন রে?”
-“নাহলে চাঁদের পাহাড় ওখানে হয় কী করে?”
-“ওটা ওর নাম সোনা, চাঁদের পাহাড়”
-“ওটা সত্যি আছে?”
-“তা তো জানি না। আছে হয়তো, হয়তো বা নেই”
-“তুমি জানো না কেন মা? মা রা তো সব জানে!”
-“মা রা সব যেমন জানে, আবার অনেককিছু জানেও না, সোনা”
-“এটার মানে কী মা? আমি বড় হয়ে বুঝবো?”
-“ হা হা, হ্যাঁ, বড় হলে বুঝবি”
-“আমাকে পাহাড়ে নিয়ে যাবে মা?”
-“যাবো তো, নিশ্চয়ই নিয়ে যাবো। দাঁড়া একটা ভালো মতো ট্যুর প্ল্যান করতে হবে”
-“মা আমাকে একটা নীল জ্যাকেট কিনে দেবে দীপের মতো?”
-“ডান! কিন্তু তুই আমাকে প্যাকিং এ হেল্প করবি তো? নাহলে কিন্তু বেড়াতে যাওয়াই হবে না”
-“হি হি, কি মা একটা...প্যাকিং করতে পারে না। মা, পুটুশ?  আমরা বেড়াতে গেলে পুটুশের কি হবে? বিড়াল নিয়ে যেতে দেবে মা?”
-“ওকে নীতামাসি সামলে নেবে। ঠিক আছে তো? এবার ঘুমিয়ে পড়ো”
-“উমম...আমার সোনা মা”
-“আমার লক্ষ্মীছেলে”
.....
কি নিশ্ছিদ্র অন্ধকার! বাইরেও আজ এত অন্ধকার কেন?! অমাবস্যা নাকি! জোনাকিগুলো কই! কিরকম গুমোট লাগছে একটা। ঝড় আসবে নাকি? কতদিন ঝড়ে হাঁটি না...এলোমেলো করা ঝড়, তুমুল... আঁচল উড়ে যাবে...চুল...একপশলা দমকা আদরের মতো...তারপর বৃষ্টি ...বৃষ্টি...বৃষ্টি...চোখের পাতা, ঠোঁট, গাল ছুঁয়ে আস্তে আস্তে পুরো স্নান... শান্তি...কি শান্তি!! সেই একবার বৃষ্টি ভিজে কদমফুল পাড়তে গেলাম পালচৌধুরী বাড়ির মাঠে...ফিরে এসে ঝুমকির কী জ্বর এলো, ওর সাথে আর  কোনোদিন ফুল পাড়া হলো না... আচ্ছা, কি আশ্চর্য্য, সেই কবেকার কথা এখন ভাবতে বসছি কেন?!! বসছি কি? ভাবনাগুলো আপনি  আসছে যেন...ওটা কিসের আওয়াজ? পুটুশ কাঁদছে? বাইরে নাকি? এমা! ভুলেই গেছি...অর্ক খুব বকবে...জানিস আমারও ছিলো, ঝুমঝুমি- এত্ত লম্বা কান, সাদা তুলতুলে একটা খরগোশ...বুকের মধ্যে নিয়ে শুতাম... আহ্ কি আরাম!! উফ্ গলা শুকিয়ে আসছে...জল...জল খাবো... নীতা...জল...
 .....

-“হ্যাঁ, দাদা বল? মেট্রোতে ছিলাম বলে নট রিচেবল...হসপিটাল? কী হয়েছে? দাদা, বল সত্যি করে...ওহ...ঠিক তো? হ্যাঁ আসছি...ছাড়ছি...এই দাদা, হ্যালো...শোন না ...ঠিক তো সব? হ্যালো...”

ফ্যানটা চলছে না নাকি? এত কষ্ট কেন হচ্ছে?! দম আটকে আসছে...বারান্দার জানলা নীতা বন্ধ করে গেছে মনে হয়...উঠি...উফ সারা শরীর এত ভার লাগছে কেন?!! মা গো...মা...মা...

সাত হাত দূরে বসা মানুষটার সাথে সাত সাতটা বছর একসাথে কেটেছে, ভাবছিলো পর্ণা। কতো স্মৃতি, তার সবটাই কি ভার? না, তা আজ আর মনে হয় না। চোখের নিচের দাগটা বেড়েছে মনে হচ্ছে...মাথাতেও রুপোলি ঝিলিক...এখনো রাতে ঘুম ভেঙ্গে বিছানায় সিগারেট জ্বলে? কিছু ভাবতে গেলে বুড়ো আঙ্গুলটা কপালে ঠেকে যায়? প্রশ্নগুলো ভিড় করে আসছে বুঝে বাইরে  লাউঞ্জে এসে দাঁড়ায় পর্ণা। বুকে একটা চিনচিনে ব্যথা, দাদাকে বললেই তো অস্থির হয়ে যাবে। কী বলার জন্য ডাক্তারবাবু ডাকলেন ওকে- অপেক্ষা আর অপেক্ষা...সাইঁত্রিশ বছরের জীবনটার অর্ধেক যেন অপেক্ষাতেই কেটে গেলো...নানা রঙের নানান রকম অপেক্ষা...তবে এই মুহুর্তে শুধুই ঘোলাটে...ওই আকাশটার মতো...

আরে ভিজে যাচ্ছি কী করে??....এত জল...এত জল এলো কোত্থেকে?? বিছানা ডুবে যাবে যে.... কী..পায়ের পাতা ডুবে গেলো... ভয় লাগছে...মাগো...শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে...অর্ক....অর্ক......অর্ক
.........
কি প্যাথেটিক সত্যি, জানেন ডঃ মিত্র, এই কয়েকদিন আগেই ওনার ছেলেটা....
হ্যাঁ, শুনলাম। হেপাটাইটিস, এখানেই তো ছিলো...ভেরি স্যাড। সিভিয়ার শক থেকে ভদ্রমহিলা সিঙ্ক করছিলেন...কার্ডিওজেনেরিক শক...  আমার অবাক লাগলো একটা জিনিস, লাইফ সাপোর্ট চলাকালীন যেভাবে র‌্যাপিডলি সব ফেইল করে গেলো, মনে হলো ওঁর শরীরের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোনো কোষেও বাঁচার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে রাখা ছিলো না...ভেরি স্যাড, আই মাস্ট সে।
 ......................

লেখা লেখা করে পাগল করে দিচ্ছিলো ছেলেটা, বছর কুড়ি-বাইশের বাচ্ছা একটা ছেলে। নতুন পত্রিকার প্রথম সংখ্যা। মুখটা দেখে আর না করতে পারেননি পারমিতা, মায়া মায়া চোখদুটো একেবারে যেন....
চশমার কাঁচটা মুছতে মুছতে জানলায় এসে আকাশে তাকান, কোথায় যে গেলো তারাটা...কোথায় গেল...!
স্টাডি টেবিলে সদ্য শেষ হওয়া গল্পের পাতায় ঝড় তুলেছে ফুলস্পিড ফ্যান....খাতার সামনে ফ্রেমবন্দী এক টুকরো সূর্য, পাহাড়ের কোলে...নীল জ্যাকেটে মোড়া।

Comments

Popular posts from this blog

আনকথা #১২

অলিখিত #৩

অলিখিত #৪